মান্দায় ফসলি জমিতে চলছে অবৈধ ভাবে পুকুর খনন, প্রশাসনের ভূমিকা রহস্যজনক

400
অবৈধ ভাবে পুকুর খনন; প্রশাসনের ভূমিকা রহস্যজনক। ছবি- প্রতিনিধি

 

ফারমান আলী, নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি :-  নওগাঁর মান্দায় প্রশাসনের নাকের ডগায় ফসলি জমিতে চলছে অবৈধ ভাবে পুকুর খনন। জমি মালিকদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে উপজেলার শরতলা বিলের মাঠে প্রায় ৬০ বিঘা ধানী জমিতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল রাতের আঁধারে চালিয়ে যাচ্ছে খনন কাজ।

ফসলি জমিতে পুকুর খননের বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করার ৬দিন পার হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি। ভূমি আইন লঙ্ঘন করে প্রকাশ্যে আবাদি জমি খনন করা হলেও স্থানীয় প্রশাসন দেখেও যেন না দেখার ভান করছেন। প্রশাসনের এমন ভূমিকা নিয়ে এলাকাবাসির মাঝে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।

সরেজমিনে দেখাগেছে, উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের (মাউল মৌজার) শরতলা নামক বিলের মাঠের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার থেকে দুটি এস্কেভেটর (ভেকুমেশিন) দিয়ে বোরো ধানের জমিতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ফিট গভির করে পুকুর খনন কাজ চলছে।

বিলের আবাদি জমিতে এভাবে পুকুর খনন করা হলে প্রত্যেক মৌসুমে ঐ জমি থেকে প্রায় দেড় হাজার মণ বোরো ধানের উৎপাদন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। তেমনি বেকার হয়ে পড়বেন বিল কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকটি গ্রামের সহস্রাধিক মৎস্যজীবী পরিবার।

জানাগেছে, রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বানইল গ্রামের আব্দুল বারিক ও সামসুল ইসলাম নামে দুই ব্যক্তি মান্দা উপজেলার মাউল মাঠের প্রায় ৬০ বিঘা ধানী জমি প্রতিবিঘা ২০ হাজার টাকা দরে বাৎসরিক চুক্তিতে কৃষকদের কাছ থেকে লিজ নেন। এরপর রাজশাহীর কেশরহাট এলাকার সোহেল রানা নামে আরেক ঠিকাদারের সহায়তায় গত বৃহস্পতিবার থেকে এস্কেভেটর মেশিন মাঠের চারদিকে বাঁধ দিয়ে সেখানে পুকুর খনন কাজ শুরু করা হয়।

আরো জানাগেছে, উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে নদী-নালা খাল-বিল বাদে প্রায় ২৮ হাজার হেক্টর ফসলি জমি রয়েছে। শ্রেণিভেদে প্রায় সকল জমিতেই সারা বছর কোনও না কোনও ধরণের ফসল হয়। কিন্তু কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি এবং উৎপাদিত ধানের যথাযথ মূল্য না পাওয়ায় প্রতি বিঘা জমি ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে মাছ চাষিদের সাথে ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদের চুক্তি করছেন কৃষকরা। চুক্তির আওতায় তাদের ফসলি জমি পুকুরে পরিণত করা হচ্ছে। জমির সেই মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রয় করছে পুকুর ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয়রা জানান, গ্রামের লোকজনের বাধা উপেক্ষা করে খননকাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ বিলকে ঘিরে পুকুরিয়া, মাউল ও টেপড়া গ্রামের একটি বৃহৎ অংশ মৎস্যজীবী পেশার সঙ্গে জড়িত। এখানে পুকুর করা হলে এলাকার প্রায় দুইশ বিঘা আবাদি জমি কমে যাবে। তেমনি বিলের আশ পাশের জমিগুলো হুমকির মুখে পড়ে যাবে।

পুকুরিয়া গ্রামের মৎস্যজীবী বিফল চন্দ্র, মাউল গ্রামের নিতাই চন্দ্র হালদারসহ বেশ কয়েকজন মৎসজীবী জানান, বোরো ধান কেটে নেওয়ার পর পুরো মাঠ ফাঁকা অবস্থায় পড়ে থাকে। বর্ষা শুরু হলে বিলে পানি জমে প্রচুর পরিমাণ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন হয়। এ সময় এলাকার কয়েক গ্রামের প্রায় নয় শতাধিক মৎস্যজীবী পরিবার বিলে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। এখানে যদি পুকুর খনন করা হয় তাহলে আমরা তো অনাহারে মরবো। আমরা জেলেরা মাছ শিকার করে সারা বছর ভরপোশন চালাই। বিলের মধ্যে পুকুর হলে তো আমাদের আর মাছ ধরতে দিবেনা আর মাছ না ধরলে আমরা চলব কি করে। আয়ের পথ বন্ধ হলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চরম বিটাকে পড়তে হবে তাদের বলে জানান তারা।
স্থানীয় বেলঘরিয়া গ্রামের দেলোয়ার হোসেন বলেন, এগুলা তো ফসলী জমি, এখানে পাশেই গভির নলকুপ (ডিপ টিবওয়েল) রয়েছে সেচ ব্যবস্থাও ভালো। এ জমি গুলোতে ভালো ফসলও হয়। এখানে পুকুর হলে পাশের জমি গুলো হুমকির মুখে পড়ে যাবে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে।

মিরাজ উদ্দীন নামে আরেক কৃষক বলেন, আগে এই জমিগুলো আমরা চাষ করতাম ভালো ফসল হতো। এখন এই জমিতে পুকুর করা হচ্ছে তরা রাতের বেলা লুকিয়ে খনন করছে। সরকার যদি পুকুরের অনুমোদ দেয় তাহলে দিনের বেলা খনন কাজ করুক রাতের বেলা খনন করা হচ্ছে কেন?
জমির মালিক মাউল গ্রামের শাহজাদ হোসেন বলেন, এই জমিতে আমরা ঠিকমত ফসল পাইনা। ধান লাগাতেও পানি কাটতেও পানি হয়, তাই বিঘা প্রতি ২০হাজার টাকা হারে বাৎসরিক চুক্তিতে পুকুর কাটার জন্য লিজ দিয়ে দিয়েছি।

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বানইল গ্রামের আব্দুল বারিক ও সামসুল ইসলাম বলেন, আমরা কৃষকদের কাছ থেকে বাৎসরিক চুক্তিতে জমি লীজ নিয়ে ঠিকাদার সোহেলকে পুকুর কাটার জন্য সব দ্বায়ভার দিয়েছি সে প্রশাসন থেকে সকল কিছু ম্যানেজ করে কাজ করছে। সে কিভাবে কাকে ম্যানেজ করেছে আমরা জানিনা।

ঠিকাদার সোহেল রানা বলেন, নিচু জমিতে পুকুর করতে সরকারের কোন অনুমোদন লাগেনা। এটা বিলের ডোবা জমি তাই সেখানে পুকুর কাটা হচ্ছে। রাতের আঁধারে পুকুর কেন কাটা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান তিনি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শায়লা শারমিন জানান, বিলের মাঝে এভাবে আবাদি জমিতে পুকুর খনন করা হলে কৃষিতে এর বিরুপ প্রভাব পড়বে। স্বাভাবিক ভাবেই আমার উপজেলার ধান উৎপাদন কমে যাবে। মাউল বিলের জমিতে ভালো ধান উৎপাদন হয় সেখানে প্রতি বিঘাতে ২৫মনের উপর ফলন হয়। কোনো ভাবেই সেখানে পুকুর করতে দেওয়া সঠিক হবে না।

মান্দা উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) ইমরানুল হক বলেন, ফসলি জমিতে সরকারি ভাবে পুকুর করা নিষেধ রয়েছে। কেউ যদি ফসলি জমিতে পুকুর খনন করে তবে সেটা সম্পূর্ন বে-আইনি। এমন কোন সংবাদ পেলে আমরা দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করি। আর মাউলের পুকুর খননের বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং ভেকু মেশিনের চাবি জব্দ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে মান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আব্দুল হালিম বলেন, মান্দা উপজেলাতে অবৈধ ভাবে কৃষি জমিতে যারা পুকুর খনন করছে তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জরিমানাও করা হয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা জারী ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের এক-দু’দিন বাদেই সেখানে পুনরায় খনন কাজ চলতে থাকে। কিভাবে সে জায়গা গুলোতে পুরনায় খনন কাজ অব্যহত থাকে এ বিষয়টি জানতে চাইলে এর সঠিক কোন জবাব দিতে পারেনি ইউএনও।

জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের তথ্যমতে নওগাঁ জেলায় দ্রুত হারে কমছে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ। জেলার রাণীনগর, আত্রাই ও মান্দার বিপুল পরিমাণ জমিতে অবাধে চলছে পুকুর খনন আর এসব মাটি যাচ্ছে ইট ভাটায়। গত কয়েক বছর ধরে জেলার সর্বত্রই উর্বর ফসলী জমিতে পুকুর খনন করা হচ্ছে। উচ্চমূল্যে জমি ভাড়া কিংবা কিনে একশ্রেণীর অসাধু লোক কৃষিজমিতে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের জন্য অপরিকল্পিতভাবে নির্বিচারে পুকুর ও দীঘি খনন করছেন। এভাবেই উদ্বেগজনক হারে নওগাঁতে কৃষি জমির হার কমছে। ফলে যেমন কমছে কৃষি জমি, তেমনি পুকুর, দীঘি আর জলাশয়ের কারণে ফসলের মাঠে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক প্রত্যাশা প্রতিদিন এর দায়ভার নেবে না।