বারোমাসি কার্টিমন আমের বাগান করে সফলতার স্বপ্ন দেখছেন ব্যবসায়ী আজিজুল

312

নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি: বারোমাসি কার্টিমন আমের বাগান করে সফরতার স্বপ্ন দেখছেন ব্যবসায়ী আলহাজ¦ আজিজুল হক। আর সেই স্বপ্নকে তিনি বাস্তবে রুপান্তর করতেই রাত দিন কাজ করে যাচ্ছেন। গড়ে তুলেছেন মনোমুগ্ধকর একটি আম বাগান। আর গাছে গাছে আমের সমারহ। নতুন জাতের এই আমের ভরে নুইয়ে পড়েছে গাছ। মাত্র ১০মাস বয়েসেই এসেছে ফলন। এরই মাঝে তিনি দুই দফা আম বিক্রি করেছেন।

আজিজুল হক জানান, দীর্ঘ দিন থেকে আমের বাগান করার জন্য স্বপ্ন দেখতেন। সেই ভাবনা থেকে আমের বাগান করি। বাড়ীর পাশে প্রসাদপুর মাঠে আড়াই বিঘা জমিতে ৫১৪টি আমের চারা রোপন করি। আড়াই বিঘা জমি প্রস্তুত করা, চারা লাগানো ও জমির চার পাশ বেড়া দেয়াসহ খরচ হয়েছে ১লাখ ৩৪ হাজার ৫শ টাকা। পরবর্তীতে মানুষ ও গরু ছাগলের রুপদ্রুপ থেকে ফসলকে রক্ষা করতে জিআই তাড়ের বেড়া দেওয়ায় অতিরিক্ত আরো ৫০হাজার টাকা বেশী গুনতে হয়েছে। মা চারা গাছ পাশের গ্রামের এক নারসারি মালিক চুয়াডাঙ্গা থেকে নিয়ে আসেন। সেখান থেকে আমি ১১০টাকা পিচ চারা সংগ্রহ করি। দশ মাস বয়েসে প্রতিটি গাছে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ১০টা পর্যন্ত আম ধরেছে। অতিরিক্ত বর্ষার কারণে আমে গুটি একটু কম হয়েছে। তবে কৃষি অফিসের পরামর্শে ওষুধ স্প্রে করা হচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে বাগান করেন। প্রথম বার ১০মাস বয়েছে ৩শ টাকা কেজি দরে কিছু আম বিক্রিয় করেছেন। গত মঙ্গলবার দ্বিতীয় বার ৪০ কেজি আম বিক্রিয় করেন। প্রতি মন আমের মুল্য ১২হাজার টাকা। ১৫ থেকে ২০ দিন পরে আরো প্রায় ২০কেজি আম বিক্রি হবে হলে আশা করছি। দুই বছরের মধ্য আম বাগানের সম্পূর্ণ খরচ উঠে আসেবে। দুই বছর পরে তেমন কোন খরচ হবে না। একটি আম গাছ ২০বছর পর্যন্ত ফল দিবে। এই বিশ বছর সম্পূর্নটায় লাভ হবে। প্রতিটি গাছেই কম বেশী আম ধরছে। অনেক গাছে নতুন করে মুকুল আসছে। কোন কোন গাছে আবার মুকুল থেকে আমের গুটিও দেখা দিয়েছে। সেই আম আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। সারা বছর আম পাবো এতে মনে আনন্দ জাগছে। আমার স্বপ্ন পুরুন হতে চলেছে। এখন আজিজুল হকের চোখে সফলতার রঙিন স্বপ্ন। সাধারনত অষ্ট্রেলিয়া ভারতসহ বেশ কিছু দেশে বারোমাসি আমের চাষ হলেও বাংলাদেশ অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে।

আলহাজ¦ আজিজুল হকের বাড়ী নওগাঁ মহাদেবপুর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা ইশ^রলক্ষীপুর গ্রাম। গ্রামের পাশের ছোট একটি বাজার যার নাম পাঁঠাকাটা বাজার। সেই বাজারেই গড়ে তুলেছেন তার ব্যবসায়ী প্রতিষ্টান, রড, সিমেন্ট, লোহা ও টিনের দোকান। ব্যবসা ভালই চলতো কিন্তু কোন কিছুতে ব্যবসায় তার মন বসতো না। দোকান ছেলের হাতে দিয়ে অনেক চিন্তা ভাবনা করে বারোমাসি কার্টিমন আমের বাগান করেন। বাগান করার পর ১০মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে ফসলতা তার হাতে এসে ধরা দিয়েছে। তিনি এখন একজন সফল বারোমাসি আম চাষী হিসেবে এলাকায় পরিচিত।

লেখা পড়া শেষ করে গতানুগতিক ভাবে ধান চালের ব্যবসা করেছেন বেশ কয়েক বছর ধরে। কিন্তু ধান চালের ব্যবসা থেকে খুম বেশী মুনাফা আসতো না। কয়েক বছরেই বুঝতে পারেন, তিনি দিন বদলের যে স্বপ্ন দেখছেন তা ধান চালের ব্যবসা করে পুরুন হবার নয়। তবে কৃষি কাজ দিয়েই নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারবেন- এমন বিশ^াস ছিল তার। এক পর্যায়ে ধান চালের ব্যবসা বাদ দিয়ে ফুল ও সবজির চাষ শুরু করেন। ফুল ও সবজি চাষে কাঙিখত মুনাফা পেয়েছিলেন। এতে তার মনে আত্নতৃপ্তি আসে না। এরপর রড, সিমেন্ট, লোহা ও টিনের দোকান করেন। তাতে তার মন ভরে না। আত্নবিশ^াসী আজিজুল এরপর শুরু করেন বারোমাসি আম চাষ। এখন তিনি সফল। তার রঙ্গীন স্বপ্ন বাস্ববে এসে ধরা দিয়েছে। এখন তিনি আম বাগান বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছেন। আগাদীতে ১০ বিঘা জমিতে আম বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। আজিজুলের মতে, ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা স্বপ্ন নয়, যে স্বপ্ন মানুষকে ঘুমানে দেয় না। সেতাই প্রকৃত স্বপন। সেই স্বপ্নকেই তিনি বাস্তবে রুপ দিয়েছেন।

মাওলানা ইউনুস আলী বলেন, ২৭বছর ধরে আমি নারসারিতে উৎপাদন সহ শ্রম দিয়ে আসছি। গবেষনার মাধ্যমে বিভিন্ন জাতের আম বাংলাদেশে পৌঁছেছে। গত মাসে বগুড়াতে এক প্রশিক্ষনে জানানো হয়, আগামী ৫ বছরের মধ্য আমাদের এই দেশে (বাংলাদেশে) কার্র্টিমন আম ছাড়া অন্য কোন আম মানুষ লাগাবেও না এবং খাবেও না। কারন এই আম বারো মাস ধরে এবং দাম ও বেশী। আশা করা যাচ্ছে ২বছর পূর্ণ বয়স্ক একটি আম গাছে কমপক্ষে ৩০ কেজি আম উৎপাদন হবে প্রতি বছর।

স্থানীয় কৃষক লুৎফর রহমান জানান, সারা বছর আম পাওয়া যাবে। আমি কখনো কল্পানা করিনি। আমি আজিজুল হকের বারোমাসি কার্টিমন আম বাগান দেখে খুশি হয়েছি। এখন আমিও মনে মনে ভাবছি বারোমাসি আমের বাগান করবো। নারসারি মালিকের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা আমাকে চারা দিতে চেয়েছেন। আমার মতো এলাকার অনেক কৃষক এই বারোমাসি আম বাগান করতে আগ্রহ প্রকাশ করছে।

শিক্ষিত যুবক শাহীদ হাসান তদফদার শাকিল জানান, আজিজুল হকের বারোমাসি কার্টিমন আমের বাগানের মাধ্যমে আমরা ফরমালিনমুক্ত সু-স্বাদু আম খেতে পারছি। আমিও তার দেখে বারোমাসি আমের বাগান করতে চাচ্ছি। তাঁর বারোমাসি আম চাষে আমি উদ্বুদ্ধ হয়েছি। চারা নিয়ে আমিও চাষ শুরু করব ভাবছি। চারার জন্য অর্ডার দিয়েছি।

যারা বারোমাসি আমের বাগান করবেন তাদের জন্য আজিজুল হকের পরামর্শ হলো, বর্ষা মৌসুম (বর্ষার শুরু) আম গাছ লাগানোর উপযুক্ত সময়। আবশ্যই পলি, এঁটেল ও দোঁ-আশ মাটি হতে হবে। আলো বাতাস ও পর্যাপ্ত রোদের তাপ থাকে এমন জায়গায় চারা রোপণ করতে হবে। গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত পরিমানে জৈব সার দিয়ে গাছ রোপণ করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে গাছের যত্ন নিতে হবে। গাছের গোড়ায় যে পানি জমতে না পারে, সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। মাঝে মাঝে গাছের অগাছা পরিস্কার করে, গোড়ার মাটি আলগা করে দিতে হবে। এসময় গাছের পাতায় মকর নাশক স্প্রে করতে হবে। কারন একজাতীয় পোকা এই গাছের পাতা ও ফল খেয়ে ফেলে। তাই প্রতিনিয়ত খেয়াল রাখতে হয়।

মহাদেবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অরুন কুমার রায় বলেন, ভাত নির্ভর বাংলাদেশের মানুষকে কি ভাবে, আধুনিক মালেশিয়ার মতো ফল নির্ভর করা যায়, সেই পরিকল্পনা করে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার ও কৃষি বিভাগ। বিভিন্ন ভাবে ফলমুল চাষ করে ভাতের ওপর থেকে চাপ কমাতে হবে। আমের ভরা মৌসুমে চাষিরা দাম পান না। কারণ এ সময় আম একসাথে বাজারে ওঠে। কৃষি বিভাগ থেকে নতুন জাত বারোমাসি কার্টিমন সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বারোমাস আম বাজারজাত করা হলে চাষীরা ভালো দান পারেন।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) শামসুল ওয়াদুদ জানান, বারোমাসি কার্টিমন আমের উৎপাদন থেকে শুরু করে এগুলো যাতে পোকা মাকড়ের আক্রমন থেকে রক্ষা পায় সেজন্য আমরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ সব সময় দিয়ে থাকি। আম মটর দানার মতো হলে পোকা এবং ছত্রাকজনিত মোড়ক রোগ দমনে কীটনাশক স্প্রে করতে হবে। আমি মনে করি, আমাদের বারোমাসি কার্টিমন আম চাষি আজিজুল হক নি:সন্দেহে দেশের আগামী দিনের বারোমাসি ফলমুল চাষীদের জন্য একজন অনুপ্রেরণা দায়ক ব্যক্তি হয়ে থাকবেন।

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক প্রত্যাশা প্রতিদিন এর দায়ভার নেবে না।