কালাইয়ে ফাতেমা ধান বীজ কিনে সর্বশান্ত কৃষক

249

রকিবুল হাসান, ভ্রাম্যমাণ (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি :‘আমি অত্যন্ত গরীব মানুষ। পরিবারের ৭ সদস্যের ভরণপোষণ একাই সামালাই। সংসারে টানাপোড়ন লেগেই থাকে। অভাব দূর করার আশায় ব্রাক অফিস থেকে এক লাখ টাকা ঋণ তুলে বর্গা নিয়েছি ৬ বিঘা জমি। বীজ রোপন মৌসুমে পুনট বাজারের বীজ ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানের কাছে ব্রি-৪৯ জাতের ধান বীজ কিনতে গেলে তিনি ফাতেমা জাতের ধান চায়ের পরামর্শ দেন। এই বলে যে, বিঘা প্রতি এ ধানের ফলন হয় ৩০ থেকে ৩৫ মণ। তার পরামর্শে ফাতেমা ধান চাষ করে এখন নিঃস্ব হয়েছি।’ কান্না জড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলেন, উপজেলার গোহারা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক মন্টু মণ্ডল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেবল মন্টুই নয়, বেশ কিছু ডিলারদের উৎসাহ ও পরামর্শে সরকার অননুমোদিত ফাতেমা ধান চাষ করে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার অন্তত দেড়শত জন কৃষক এবার সর্বশান্ত হয়েছে। এক থেকে ৬ বিঘা জমিতে ফাতেমা ধান চাষ করে নিঃশ্ব হওয়া ভুক্তভোগী কৃষকের তালিকায় আছেন- উপজেলার উলিপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম, একই গ্রামের খাজা মিয়া, কাহার মিয়া, নুরনবী, হায়াত, হানিফ,রহেদ আলী, লুলু মিয়া, হারুন, জাহিদুল ও হায়দার; ভেরেণ্ডী গ্রামের আরিফুল, নুরনবি, বদিউজ্জামান, নূর মোহাম্মদ, বাদশা মণ্ডল, আনোয়ার, বায়জিদ, মাসুদ ও ফরিদুল; পাইকশ্বর গ্রামের বক্কর আলী ও নূর ইসলাম; তেলিহার গ্রামের ফরহাদ; থল গ্রামের বেলাল. ঠাণ্ডা মিয়া, সামছুল ও তোফাজ্জল; বোড়াই গ্রামের ফেরদৌস, আশরাফ, মুনছুর, শাহীন, মোস্তফা, তাহের, সামিউল, কামরুজ্জামান, তুষার ও নুর মোহাম্মদ; ঝামুটপুর গ্রামের শাহীনুর, সামিউল, লিটন, রবিউল, আলাউদ্দিন, মোজাফ্ফর হাজী, এমদাদুল, সামসদ্দিন, সামচের, আইজুল ও মেহেদুল; আঁওড়া গুচ্ছগ্রামের সাইদুর রহমান; তালোড়া বাইগুনী গ্রামের মেহেদুল, তহিদুল, সাইদুর, এমরান ও জাফরুল; চকমুরলি গ্রামের মোতালেব; উতরাইল গ্রামের জাহিদুল; মোহাইল গ্রামের রতন, খোসালপুর নওপাড়া গ্রামের সরোয়ার ফকির এবং কালাই তালুকদার পাড়া মহল্লার সিরাজুল ইসলাম তালুকদার প্রমুখ।

সরকার অননুমোদিত ফাতেমা ধান চাষ করতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা বীজ ডিলারের তালিকায় আছেন- উপজেলার বৈরাগীরহাট এলাকার আবু সায়েম ও মুর্শিদ আলম, ঝামুটপুর এলাকার রাইহান আলী, পুনট বাজারের মিজানুর, পাঁচশিরা বাজারের আবু বকর প্রমুখ।

উপজেলা কৃষি বিভাগ জানান, উপজেলার ১৩ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে এবার রোপা আমন ধান চাষ করা হয়েছে। তন্মধ্যে ৪৫ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয় সরকার অননুমোদিত ফাতেমা ধান।

জানা গেছে, ডিলারদের উৎসাহে ‘ফাতেমা’ জাতের ধান চাষ করে ফসল হানীর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ক্ষতিপূরণের দাবিতে সম্প্রতি উপজেলার বৈরাগীহাটে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ করেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ দিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগে অনুলিপি দেন। এ খবর মিডিয়ায় প্রচার হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করেন। সরকার অননুমোদিত বীজ বিক্রির দায়ে দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নীলিমা জাহান জানান, বীজ সংক্রান্ত বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার এখতিয়ার ‘জেলা বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি’র। তাই তাদেরকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কৃষি অফিসের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুই ডিলারকে জরিমানা করা হয়েছে। অন্যান্য ডিলারদের সাথে কথা বলা হচ্ছে। যেখান থেকে এ বীজ আনা হয়েছে তাকেও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তবে, এ বিষয়ে জেলা বীজ প্রত্যয় বিভাগের তদারকি করা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক প্রত্যাশা প্রতিদিন এর দায়ভার নেবে না।