কাহালু থিয়েটারের ৩৮ বছর পূর্তি- এখানো নাট্যচর্চায় অবিরাম গতি

1068

কুতুব শাহাব উদ্দিন, কাহালু (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ-  হাতের মুঠোয় হাজার বছর আমরা চলেছি সামনে নাট্যাচার্য ড. সেলিম আলদীনের এই স্লোগানের আলোকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে তিন যুগ পেরিয়ে ৩৮ বছর ধরে সাংস্কৃতিক ও নাট্যচর্চায় বগুড়ার কাহালু থিয়েটার। বীরমুক্তিযোদ্ধা কৃষিবিদ বজলুর রশিদ রাজা মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে স্থানীয় তরুণদের নিয়ে নাট্যাচার্য ড. সেলিম আলদীন, শিল্পপিতা বীরমুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও নাট্যজন তৌফিক হাসান ময়নার অনুপ্রেরণায় ১৯৮৩ সালের ২৩ মে প্রতিষ্ঠা করেন কাহালু থিয়েটার।

প্রতিষ্ঠাকালে আঃ হান্নানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো, স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনদেরকে নিয়ে কাহালু থিয়েটারকে একটি ভালো নাট্য সংগঠন হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য। আঃ হান্নানের প্রচেষ্টায় বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম, সংকৃতজন বিমল কুমার সরকার, সুলতান আলী কবিরাজ, মোঃ হেলাল কবিরাজ, নজরুল ইসলামসহ স্থানীয় তরুণদের সমন্বয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কাহালু থিয়েটারের যাত্রা শুরু হয় মোঃ হেলাল উদ্দিন কবিরাজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঘর থেকে। সেখান থেকে পথচলার শুরু হয়ে এখন পর্যন্ত কাহালু থিয়েটার অবিরাম গতিতে নাট্যচর্চা করে যাচ্ছে।

প্রাচীন পুন্ডনগরী বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলার ঐতিহ্যবাহী এই নাট্য সংগঠনটি নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে স্ব-দর্পে। নাট্যচর্চা ও গ্রাম থিয়েটার আন্দোলনে সক্রিয় এই সংগঠন নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দেশের গন্ডি পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নাট্যজনদের কাছে পরিচিতি লাভ করেছে অনেক আগেই। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে সফলভাবে অসংখ্য নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে প্রসংশিত হয়েছে নাট্যপ্রেমী ও নাট্যজনদের কাছে।

কাহালু থিয়েটারের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এখান থেকে দিক্ষা নিয়ে এপর্যন্ত গুণী শিল্পী, নাট্যকার, লেখক, রাজনৈতিক নেতাসহ অসংখ্য সফল মানুষ দেশ ও জাতীর কল্যানে নিবেদিত রয়েছেন। কাহালু থিয়েটার সৃষ্টি করেছে দেশের খ্যাতিমান সুরকার মান্নান মোহাম্মদ, গীতিকার শেখ রেজা শানু, চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও গুণী শিল্পী আনজুমান্দ আরার মত অসংখ্য গুণী শিল্পী। নাট্যচার্য ড. সেলিম আলদীন, শিল্পপিতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও নাট্যজন তৌফিক হাসান ময়নার দিক-নির্দেশনায় স্থানীয়ভাবে নাট্যকার ও নির্দেশক সৃষ্টিতেও সফল কাহালু থিয়েটার। কাহালু থিয়েটারের শাহাজাত আলী বাদশার লেখা নাটক এখন বিভিন্ন স্থানে মঞ্চায়নের পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মঞ্চায়ন হয়েছে তার লেখা সেতারা বানুর কিচ্ছা নাটক।

এছাড়াও কাহালু থিয়েটারের জিয়াউল আলম ধুমকেতু, আব্দুল হান্নান, অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম ও মুনসুর রহমানের বেশ কয়েকটি পথ নাটক নিজ এলাকা ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে পরিবেশিত হয়েছে। কবিতা লিখছেন কাহালু থিয়েটারের তারেক সুমনসহ অনেকে। কাহালু থিয়েটারের অনেকে আবার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধি হয়েছেন। কাহালু থিয়েটারের নাটক ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান বিটিভি, এটিএন বাংলা ও চ্যানেল আইয়ে প্রচারিত হয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শাস্তি, নাট্যচার্য ড. সেলিম আলদীনের বাসন, গন্থিক গণ কহে, শিল্পপিতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর একাত্তরের পালা, আব্দুল্লাহ আল মামুনের সুবচন নির্বাসনে, শামসুদ্দিন আহম্মেদ পিয়ারার গবেষনা ধর্মী বাঙ্গালীর বঙ্গবন্ধু এই ধরনের বড়মাপের নাটক মঞ্চায়নে সফল হয়েছে কাহালু থিয়েটার। এছাড়াও চৌদ্দ গোষ্ঠীর পিন্ডি, বিষনালা, কাকলাস, ক্ষত, ভয়াল রাত্রি, ফাগুনের ফুলকি, অঞ্চলের একাত্তর, বিরঙ্গনার কথা, নয় অপমৃত্যুসহ অসংখ্য নাটক কাহালু থিয়েটার মঞ্চায়ন করেছে।

শিকড়ের সন্ধানে কাহালু থিয়েটার স্থানীয় পৌরাণিক ঘটনা প্রবাহ ও বিভিন্ন পালাও জনসম্মুখে হাজির করেছে যাত্র, বাউল ও পালাকারদের মাধ্যমে। বর্তমানে কাহালু থিয়েটারের সংগঠক ও থিয়েটার কর্মী প্রায় প্রত্যেকেই ভালো অভিনেতা ও নাট্য নির্দেশক। তারা নিজ সংগঠন ছাড়াও গ্রাম থিয়েটারের বিভিন্ন ইউনিটে গিয়ে নাট্য নির্দেশনার কাজও করে থাকেন। সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতেও কাহালু থিয়েটারের নাট্যযোদ্ধারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পথ নাটকের মাধ্যমে হাজারো দর্শকের মন জয় করেছেন।

গণপ্রজান্ত্রী বাংবাদেশ সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্ত, স্বাস্থ্য ও পরিকল্পনা অধিদপ্তর, সুইচ কন্টাক, ইউনিসেফ বাংলাদেশ, পায়াকট, সেভ দ্যা চিলড্রেন, মাত্রা, লাইট হাউসসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে কাহালু থিয়েটার দায়িত্ব পেয়ে জনসচেতনতা মূলক গণ নাটকের পান্ডুলিপি তৈরী ও নাটক পরিবেশনা করেছে দেশের বেশ কয়েকটি জেলার হাজারো স্থানে। করোনার মহামারীতে কাহালু থিয়েটার মানুষকে রক্ষায় অনেক সচেতনতা মূলক কাজ করে যাচ্ছে। করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়া স্থানীয় অসহায় যাত্রা, নাট্য, বাউল শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সাধ্যমত সহযোগীতা দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নাট্যচার্য ড. সেলিম আলদীন, শিল্পপিতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, মঞ্চ কুসুম শিমুল ইউসুফ, নাট্যজন হুমায়ুন কমির হিমু, পিযুষ বন্দোপাধ্যায়, মামুনুর রশিদ, হুমায়ন ফরিদী, সুবর্ণা মোস্তফা, শহিদুজ্জামান সেলিম, ঝুনা চোধুরী, জাহিদ হাসান, লোক গবেষক কাজী সাঈদ হোসেন দুলালসহ অসংখ্য গুণী মানুষের পূণ্য চরণের ধুলিতে ধন্য হয়েছে নাট্যচর্চার পূণ্যভুমি কাহালু থিয়েটার। মোটকথা নাট্যচর্চা, সাংস্কৃতিক চর্চা, সাহিত্য চর্চা এবং সৃজনশীল ও নান্দনিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়েই কাহালু থিয়েটার দেশ ও দেশের বাহিরে অনেকের কাছেই একটি পরিচিত সংগঠনের নাম কাহালু থিয়েটার।

বর্তমানে কাহালু থিয়েটারের সভাপতি আব্দুল হান্নান বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদক শাহাজাদ আলী বাদশা পুন্ড অঞ্চলের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন। ২৩ মে কাহালু থিয়েটারের জন্মতিথিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরোয়াভাবে সীমিত আকারে অনুষ্ঠানের প্রস্ততি নিয়েছে। কাহালু থিয়েটারের সভাপতি আব্দুল হান্নান জানান, একদিন কেটে যাবে অন্ধকার, ফিরে আসবে আলো, আমরা সবাই মিলে নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে আবারও ছড়িয়ে দিবো বাঙ্গালীর হাজার বছরের সংস্কৃতি বিশ্ববাসীর কাছে। দুর হয়ে যাবে অশুভ শক্তি, জয় হবে মানবের, প্রত্যাশা আমাদের সকলের।

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক প্রত্যাশা প্রতিদিন এর দায়ভার নেবে না।