৮ আষাঢ়, ১৪৩৩

২২ জুন, ২০২৬

বগুড়ায় ফটোসাংবাদিক ওয়াহেদ ফকিরের  মামলা নিয়ে বিতর্ক

প্রতীক ওমর প্রকাশিত: মে ৫, ২০২৫, ১১:০৯ অপরাহ্ন
বগুড়ায় ফটোসাংবাদিক ওয়াহেদ ফকিরের  মামলা নিয়ে বিতর্ক



একটি বাউল গানের কলি নিজের ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক আব্দুল ওয়াহেদকে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার করা এবং পরে মামলা দিয়ে জেলে হাজতে পাঠানোর ঘটনায় বগুড়ার সাংবাদিক অঙ্গন উত্তাল হয়ে উঠেছে। বগুড়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জ এস এম মঈনুদ্দীনের কিছু দুর্নীতির তথ্য আকার ইঙ্গিতে লেখায় আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিল ওসি। সেই ক্ষোভ থেকেই ওসি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে সাংবাদিক আব্দুল ওয়াহেদ ফকিরকে মামলায় জড়ায়। এর আগে শনিবার রাতে কোনো কথা ছাড়াই সাংবাদিক ওয়াহেদকে গ্রেপ্তার করে ওসি নিজেই। এরপর খুঁতে থাকেন বাদীকে। টানা বিশ ঘণ্টা পার হলেও বাদীর অভাবে মামলা রুজু করতে পারেন নি ওসি। পরে পাশের উপজেলা শাহাজানপুর থেকে একজনকে অনেকটা জোর করে থানায় এনে বাদী করা হয়। বাদীর নাম পলাশ কুমার মহন্ত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে থানার একজন কর্মকর্তা বলেছেন সাংবাদিকদের একজন নেতা পুলিশকে চাপ দিয়ে বাধ্য করেছে মামলা নিতে। সেই সাংবাদিক নেতার নাম অডিও রেকর্ডে রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বগুড়ার পুরো সাংবাদিক সমাজ ক্ষুব্ধ। 


দৈনিক সামতাথা পত্রিকার বার্তা সম্পাদক এফ শাহজাহান বলেন, ফ্যাসিবাদের দোসর বগুড়া সদর থানার ওসির সাংবাদিক ওয়াহেদকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি বর্তমান সরকারকে বিব্রত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। একটি গানের কলি লেখা অপরাধ সেই আইন ওসি কোথায় পেলেন? কোনো কিছু যাচাই-বাছাই ছাড়াই একজনকে সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের ধৃষ্টতা কীভাবে দেখালেন? তার পিছনে কোন শক্তি কাজ করছে তা জাতির সামনে হাজির করা হবে। 


দৈনিক ইনকিলাবের উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি মহসিন আলী রাজু বলেন, আমরা ষোল বছর অপেক্ষায় ছিলাম একটা ফ্যাসিস্ট মুক্ত বাংলাদেশ দেখতে। আমরা কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ পেয়েছিলামও। কিন্তু সেই লালিত স্বপ্ন ওয়াহেদ ফকিরের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে মামলা দিয়ে জেলে পাঠানোর ঘটানয় অনেকটা ম্লান হয়ে গেলো। পুলিশ কারো প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে এভাবে একজন মাঠের সাংবাদিককে জেলে পাঠাতে পারে সেটা আমরা নতুন বাংলাদেশে কল্পনা করিনি। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সাংবাদিক সমাজকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। 


দৈনিক বগুড়ার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজাউল হাসান রানু বলেন, এখন আমাদের বসে থাকার সময় নয়। আজ সাংবাদিক ওয়াহেদের সাথে অন্যায় আচরণ করা হলো কাল হয়ত আপনার আমার সাথেও এমন অন্যায় করা হবে। সেজন্য অন্যায়কারীদের সাথে আমাদের কোনো আপস চলবে না। প্রতিহত করতে হবে। 


দৈনিক আমারদেশ পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার সবুর শাহ লোটাস বলেন, যে গানের কলি লিখে ওয়াহেদ ফকির আজ জেলে সেই গাল বহু আগে আনোয়ার নামের এক বাউল শিল্পী গেয়েছেন। সেই গান ইউটিউব, ফেসবুকে ভাইরাল। সেই গানের গীতিকার সুরকার এবং শিল্পীর বিরুদ্ধে কোন হিন্দু ভাই অবমাননার অভিযোগ করলো না কিন্তু সেই গানের একটি কলি লেখার কারণে আমাদের সাংবাদিকের নামে মামলা দেওয়া হলো। এর পিছনে ভয়াবহ রকম ষড়যন্ত্র আছে। সেই ষড়যন্ত্রের সাথে কে কে জড়িত আছেন সেটা এখন প্রকাশ করার সময় এসেছে। আমরা সাংবাদিকের সাথে কোনো অন্যায় আচরণ সহজভাবে মেনে নিবো না। আদালত কেন তাকে জামিন দিলো না সেই বিষয়টিও গভীর ষড়যন্ত্র মনে হচ্ছে। 


মামলার বাদী পলাশ কুমার মহন্ত বলেন, সাংবাদিক ওয়াহেদ ফকিরের করা পোস্টটি সম্পর্কে তিনি রোববার সকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তাদের ধর্মাবলম্বীদের একটি গ্রুপে দেখেন। এর আগে তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।  বিষয়টি জানার পর তিনি বগুড়ার পূজা উদযাপন কমিটির নেতাদের সাথে আলোচনা করে মামলার সিদ্ধান্ত নেন।


দুপুরে বৈষম্যবিরোধী গণমাধ্যম আন্দোলন বগুড়ার উদ্যোগে প্রথমে সাতমাথায় মানববন্ধন হয়। পরে শহরের জিরো পয়েন্টে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে সাংবাদিকরা। এসময় সাংবাদিকরা বগুড়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জ এসএম মইনুদ্দিনকে আওয়ামী দোসর উল্লেখ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে প্রত্যাহারের দাবি করেন। পরে পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি এসে বিষয়টি নিয়ে সমাধানের পথ বের করার আশ্বাস দিলে সাংবাদিকরা অবরোধ প্রত্যাহার করেন। বৈষম্যবিরোধী গণমাধ্যম আন্দোলন বগুড়ার প্রধান সমন্বয়ক ও মানবজমিন পত্রিকার ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি প্রতীক ওমরের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন দৈনিক আমারদেশ পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার সবুর শাহ লোটাস। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, দৈনিক বগুড়ার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজাউল হাসান রানু, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী সদস্য মীর্জা সেলিম রেজা, সিনিয়র সাংবাদিক মীর সাজ্জাদ আলী সন্তোষ, দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার উত্তরাঞ্চল ব্যুরো মহসিন আলী রাজু, দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার বগুড়া অফিস প্রধান আবুল কালাম আজাদ, দৈনিক সাতমাথা পত্রিকার বার্তা সম্পাদক এফ শাহজাহান সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়ার সাবেক সভাপতি সৈয়দ ফজলে রাব্বী ডলার, সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়ার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মমিনুর রশিদ সাইন, সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়ার কোষাধ্যক্ষ ফেরদৌস রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক রেজাউল হক বাবু, বৈষম্য বিরোধী গণমাধ্যম আন্দোলন বগুড়ার সমন্বয়ক তানভীর আলম রিমন, সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়ার কার্যনির্বাহী সদস্য মাহফুজ মন্ডল, বৈশাখি টিভির বগুড়া প্রতিনিধি সুমন সরদার, সিনিয়র সাংবাদিক ইনসান আলী শেখ, অ্যাডভোকেট ফেরদৌসী আক্তার রুনা।


বিক্ষোভ থেকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয় সদরের ওসিকে প্রত্যাহারের জন্য। এ সময়ের মধ্যে ওসির প্রত্যাহার এবং সাংবাদিক আব্দুল ওয়াহেদ ফকিরকে মুক্তি না দিলে বৃহৎ পরিসরে আন্দোলন বেগবান করা হবে বলে হুঁশিয়ার করেন। 


উল্লেখ্য, ‘বলো ঠাকুর তুলসী গাছে, কুকুর কেন প্রস্রাব করে, গনেশ কেন হাতির মুন্ডু নিলো আপন ঘাড়ে!’ এই গানটি র কয়েক লাইন সাংবাদিক আব্দুল ওয়াহেদ ফকির তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছিলো। ফলে শনিবার তাকে সদর থানার ওসি গ্রেপ্তার করেন। পরে পলাশ কুমার মহন্ত নামের একজন ব্যক্তিকে অনেকটা জোর করে থানায় এনে মামলার বাদী করানো হয়। রোববার রাতে মামলাটি রুজু করার পর রাতেই তাকে জেল হাজতে পাঠায় আদালত। সোমবার তার জামিনের আবেদন করলে আদালত জামিন না মঞ্জুর করে।