ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনে ভোটব্যাংক তৈরি ও মাঠে সক্রিয় থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন দলটির নারীরা। তবে জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি দল থেকে কোনো নারী প্রার্থী না থাকলেও সামনে স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে মাঠে সক্রিয় দলটির নারী বিভাগ। সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান, এমনকি সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও নারী কাউন্সিলর প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত করেছে জামায়াত।
জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ ও মহিলা বিভাগের একাধিক নেত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ ১৬ বছর নির্বাচন থেকে দূরে থাকা এবং আওয়ামী লীগের নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে ভোটকেন্দ্রিক তৎপরতা কম ছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারণার সময় প্রার্থীদের সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত মুখ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রচারণার সময় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য প্রার্থীরা নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের পরও এখন তারা স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে ওয়ার্ড ও ইউনিয়নভিত্তিক কাজ করছেন।
তারা জানান, প্রার্থী ঘোষণার সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হচ্ছে, যাতে ঘোষিত প্রার্থীরা জনসেবা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে পারেন। এছাড়া প্রার্থীর নেতৃত্বে দলীয় অবস্থান সুসংহত করা এবং জনগণের আরও কাছে পৌঁছানোর কৌশলের অংশ হিসেবেই প্রার্থী ঘোষণা করছে জামায়াত।
এর আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতের মহিলা বিভাগের অংশগ্রহণ ছিল। উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন দলটির নারী নেত্রীরা।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ জানিয়েছে, সর্বশেষ ২০১৪ সালে চতুর্থ উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনে মহিলা বিভাগ থেকে ৩৬ জন নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে তৃতীয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মহিলা বিভাগ থেকে ১২ জন নির্বাচিত হন। এছাড়া ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে চারজন এবং ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত দুজন সদস্য ছিলেন। সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াত মনোনীত নারী প্রার্থী ছিলেন আটজন।
জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নেসা সিদ্দিকা বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীদের জন্য নির্ধারিত সংরক্ষিত আসনগুলোতে তাদের দল প্রার্থী দেবে। সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ—উভয় পর্যায়ের সংরক্ষিত আসনে দলীয় প্রার্থীরা অংশ নেবেন।
তিনি আরও বলেন, এসব প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব স্থানীয় সংগঠনের ওপরই দেওয়া হয়েছে এবং স্থানীয়ভাবেই প্রার্থী নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।
সংরক্ষিত আসনের বাইরে সাধারণ (উন্মুক্ত) পদে নারী প্রার্থী দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আপাতত সে ধরনের কোনো পরিকল্পনা নেই।
নুরুন্নেসা জানান, নির্বাচনে অন্য দলগুলোর নারী প্রার্থীদের সঙ্গেই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, মাঠপর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপির পক্ষ থেকে সন্ত্রাস ও হুমকির কারণে স্বাভাবিক নির্বাচনি পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের মতো বিভিন্ন এলাকায় নারীদেরও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে, যা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেও তাদের প্রচার কার্যক্রম চলমান।
জামায়াতের মহিলা বিভাগের প্রচার ও সংস্কৃতি বিষয়ক সেক্রেটারি নাজমুন নাহার নিলু বলেন, ‘সারাদেশে সিটি করপোরেশনগুলোতেও সংরক্ষিত আসনে কাউন্সিলর প্রার্থী দেবে জামায়াত। সেই প্রস্ততি রয়েছে।’
জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের বগুড়া অঞ্চল পরিচালক ও জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনীত প্রার্থী সাজেদা সামাদ বলেন, সাংগঠনিক কাজের মধ্য দিয়েই তাদের প্রচারণা চলছে। ইসলাম অনুযায়ী নারীদের মর্যাদা ও প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিতের বিষয়টি সামনে রেখে কাজ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নারীদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সমস্যা সমাধানেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সম্ভাব্য সংরক্ষিত ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী বলেন, নির্বাচনের কোনো রূপরেখা এখনো দেওয়া হয়নি। আমরা কাজ করে যাচ্ছি। প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত। ওয়ার্ড ও ইউনিয়নভিত্তিক দল গঠন করে কাজ চলছে। প্রতিটি বাড়িতে আমাদের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘জামায়াত এখন ইমেজ সংকট কাটাতে কাজ করছে এবং বিশেষ করে নারীদের রাজনীতিতে এগিয়ে আনার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। আমি সামগ্রিকভাবে এটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছি।’
তিনি বলেন, জামায়াত একটি ক্যাডারভিত্তিক দল হওয়ায় তাদের পক্ষে নারী কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও গ্রুমিং করা তুলনামূলক সহজ। অন্যরা এভাবে পারে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনসহ বিভিন্ন পদে তারা নারী প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা বাস্তবায়িত হলে দলটির ভেতরে বিশাল একটা পরিবর্তন আসতে পারে।
এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরও বলেন, ‘আমি জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে দলটির দুটি বড় ইমেজ সংকটের কথা তুলে ধরেছি, একটি ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে, অন্যটি নারীদের প্রতি দলের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। তারা সেই সংকট কাটাতে শুরু করেছে।’
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, নানা নির্যাতন ও মানসিক চাপের মধ্যেও আমাদের মহিলা বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। তাদের কেউ ঠেকাতে পারেনি। সামনে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে বিএনপি গড়িমসি করছে। তারা প্রশাসন দলীয়করণ করেছে। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন বাস্তবায়নে জোর চেষ্টা চালাব। একই সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রস্তুতিও রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মহিলা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নারী-পুরুষ মিলিয়ে দলটির ১০ লাখের বেশি কর্মী রয়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ পুরুষ ও ৪০ শতাংশ নারী। মহিলা বিভাগের সদস্যরা তিনটি স্তরে বিভক্ত—সহযোগী সদস্য, কর্মী ও রুকন। রুকন সর্বোচ্চ স্তর। প্রায় অর্ধলাখ রুকন সদস্য রয়েছেন। কর্মী রয়েছেন প্রায় চার লাখ। এছাড়া সারাদেশে অসংখ্য সহযোগী সদস্য রয়েছে মহিলা বিভাগের।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে?
এদিকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে দ্রুত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন বলেও জানান তিনি।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে চট্টগ্রাম-১৬ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য জহিরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান মন্ত্রী।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। ধাপে ধাপে অনুষ্ঠানে সব স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করতে ১০ মাস থেকে এক বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভোটার তালিকা প্রস্তুত, ভোটের সামগ্রী সংগ্রহ, ধর্মীয় উৎসব, পাবলিক পরীক্ষা, আওহাওয়া, কেন্দ্র চূড়ান্তকরণ ও সংস্কার, নির্বাচনি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে তফসিল ঘোষণা করতে হয়। তফসিল ঘোষণার প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে ন্যূনতম ৪৫ দিন প্রয়োজন হয়।
জাগো নিউজ এর সৌজন্যে