জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অতীতে কেউ কোনোদিন রেহাই পায়নি এবং বর্তমান সরকারও পাবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। শনিবার দুপুর ২টায় রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দানে আয়োজিত ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং তীব্র জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবিতে এই বিশাল সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থে রাজপথ ও সংসদে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দেন।
বক্তব্যের শুরুতে ডা. শফিকুর রহমান সাড়ে ১৫ বছরেরসি স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অসংখ্য মানুষের ত্যাগ ও কুরবানীর কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আমাদের বুকের উপর থেকে ফ্যাসিবাদী শাসন খতম করে দিয়েছেন। আজ যাদের ত্যাগের কারণে বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, যাদের কারণে সংসদ ও সরকার গঠিত হয়েছে, অনেকে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন, চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছেন এবং অনেকে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা বিরোধী দলীয় নেতা হতে পেরেছেন, তাদের আত্মা আজ আমাদের দিকে চেয়ে আছে। এই পরিবর্তন যখন হয়, তখন একদল জানবাজ তরুণ তরুণী সামনে এসে বুক চিতিয়ে ভয়কে জয় করে গুলির মুখে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। বিরোধী দলগুলো দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর আন্দোলন করলেও ফ্যাসিবাদীরা পালিয়ে যায়নি, কিন্তু যেদিন তরুণ তরুণীরা সিদ্ধান্ত নিয়ে সামনে এল এবং জনগণ তাদের ডাকে রাস্তায় নামল, সেদিনই আন্দোলন সফলতার মুখ দেখেছে।
বর্তমান সরকারি দলের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, এখন সরকারি দলের বন্ধুরা সেই তরুণদের কাউকে শিশু পার্টি বলে আর কাউকে বলে উপহাস করছেন। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক। যাদের কারণে আজ আপনাদের এই গদি, তাদের নিয়ে আপনারা উপহাস করছেন। এই জাতি ঠিকই আপনাদের কাছ থেকে পাওনা বুঝিয়ে নেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। আপনারা জাতিকে ধোকা দিয়েছেন এবং ইতোমধ্যে তা স্বীকারও করে নিয়েছেন। আপনাদের নেতাই বলেছিলেন যে আমরা যদি ধোকা দেই, আগামীতে জনগণ আমাদেরকে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে। সেই আস্তাকুড় দেখার জন্য এখন আপনাদের তৈরি হওয়া উচিত। গণভোটের রায় অগ্রাহ্য করার মানে হচ্ছে এদেশের মানুষকে অপমান করা, তাদেরকে অস্বীকার করা এবং তাদের রায়ের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো। জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অতীতে কেউ রেহাই পায়নি, আপনারাও পাবেন না। সময় থাকতে তিনি সরকারকে সৎ পথে ফিরে আসার এবং জাতির সাথে গাদ্দারি ও বেইমানি না করার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, সরকার যদি এসে জনগণের কাছে স্বীকার করে যে তারা ভুল করেছে এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করবে, তবে হয়তো জনগণ তাদের ক্ষমা করতে পারে।
সরকারকে হুশিয়ারি দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আপনারা বলেন যে আপনারা নাকি সংস্কারের প্রবক্তা এবং আপনাদের আগে কেউ সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। কিন্তু আফসোস, আপনাদের সংস্কার কর্মসূচীর প্রথম দফার সাথেই আপনারা আজকে গাদ্দারি করছেন। সেই দফায় লেখা ছিল যে আপনারা নির্বাচিত হলে দেশকে মেরামত করার জন্য সংবিধানের সংস্কার সাধন করবেন। অথচ আজকে আপনারা বলছেন যে সংবিধানের সংস্কার কি জিনিস তা আপনারা বুঝেন না। তাহলে কি আপনারা শিশুর মতো না বুঝে প্রথম দফায় তা লিখেছিলেন? আপনারা ইশতেহারে লিখেছিলেন যে বাংলাদেশের কোথাও অনির্বাচিত কোনো জনপ্রতিনিধি থাকবে না। অথচ সরকার গঠন হওয়ার পর ৪২টি জেলায় ইতিমধ্যে আপনারা অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ করেছেন। এই প্রশাসক কি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি? নিশ্চিতভাবেই না। এর মাধ্যমে আপনারা আপনাদের নিজেদের ইশতেহারের সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।
বিচার বিভাগ ও বিভিন্ন কমিশনের বিষয়ে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার যে অর্ডিন্যান্স ছিল, এখন আপনারা সেটির বিরোধিতা করছেন এবং বলছেন এটি এখন করবেন না। এর অর্থ হলো বিচার বিভাগকে নিজেদের হাতের মুঠোয় রেখে আগামী দিনে আপনাদের আকাম কুকামের প্রতিবাদ যখন জনগণ করবে, তখন সেই বিচার বিভাগকে অতীতের ফ্যাসিবাদী কায়দায় জনগণের বিরুদ্ধে আপনারা কাজে লাগাতে চান। আমরা চেয়েছিলাম ফ্যাসিবাদীদের গুম এবং খুনের সংস্কৃতি নির্মূল করার জন্য একটা স্বাধীন গুম কমিশন গঠন হোক, কিন্তু আপনারা তার বিরোধিতা করছেন। আপনারা স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন মানছেন না এবং নিরপেক্ষ কমিশনের মাধ্যমে পিএসসির নিয়োগও মানছেন না। আপনারা সম্পূর্ণ উল্টো পথে চলছেন। মনে রাখবেন, যেই পথ ধরে স্বৈরাচার চলেছিল, একই পথ ধরে আপনারাও হাঁটছেন। স্বৈরাচারের যে পরিণতি অতীতে হয়েছে, আপনাদের পরিণতিও ভিন্ন হবে না যদি এই পথ থেকে ফিরে না অসেন।
সংসদ ও সরকারের মেয়াদের কথা উল্লেখ করে জামায়াতের আমীর বলেন, এই সংসদের মেয়াদ মাত্র আড়াই মাস পার হলো। আমরা চাইনি এখনই আপনাদের শক্ত করে ধরতে। আমরা সুযোগ দিতে চেয়েছি যাতে আপনারা আপনাদের ভুলগুলোকে সংশোধন করতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, আমাদের এই উদারতাকে কোনো দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করবেন না। আপনারা ভালো কাজ করবেন, আমরা পানির মতো তরল হব। আর মন্দ ও অন্যায় কাজ করে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন, সেদিন আমরা ইস্পাতের চাইতেও কঠিন হয়ে দাঁড়াব। দেশ এবং জনগণের কোনো ক্ষতি আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না।
দুর্নীতির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনাদের নেতা বলেছিলেন যে দুর্নীতিকে টুটি চেপে ধরবেন। কিন্তু আপনারা ক্ষমতায় এসেই বললেন যে যদি সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু নেওয়া হয়, তবে সেটা চাঁদা হবে না। এই বক্তব্যের প্রতি ধিক্কার জানাই। আজকে আপনাদের পরিচয় এমন পর্যায়ে গেছে যে আপনাদের নাম ছিল জাতীয়তাবাদী দল, এখন মানুষ বলে চাঁদাবাজ দল। একজন চাঁদাবাজকেও আপনারা কব্জায় আনেননি। এর ফলে জনগণ বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছে যে মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত সবাই চাঁদাবাজ, নইলে কেন চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না? সব জায়গায় কেন দুর্নীতির মহোৎসব এবং গায়ের জোরে রাজনৈতিক দখলবাজি চলছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো সেন্ট্রাল ব্যাংকের জায়গাটাও আপনারা ঠিক রাখলেন না, সেখানে একজন দলকানা ও অযোগ্য লোককে বসিয়ে দিলেন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, আপনারা একদিকে গিয়ে বলবেন যে অতীতের রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মান রক্ষা করতে পারেনি এবং বিশ্বমানে আসতে পারে নাই। আবার আপনারাই দক্ষ ভিসি, প্রো ভিসি, প্রক্টর, প্রোভোস্ট সবাইকে সরিয়ে দিয়ে দলকানা লোকেদের সেখানে বসানো হচ্ছে। এটি জাতির সাথে একটি স্পষ্ট প্রহসন। প্রশাসনে যদি নিবেদিতপ্রাণ, দেশপ্রেমিক, দক্ষ ও যোগ্য মানুষদেরকে সরিয়ে দলকানাদের অযোগ্য জায়গায় বসানো অব্যাহত থাকে, তবে এর খেসারত শুধু জাতি দিবে না, তার আগে আপনাদেরকে দিতে হবে।
সংসদে ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি বিষয়ে কথা বলব এবং কাউকে ছেড়ে কথা বলব না। সংসদে লড়াই করব যাতে জাতির দাবিগুলো শান্তিপূর্ণভাবে আদায় হয়। কিন্তু সেখানে যদি স্পিকারের অনুমতি নিয়ে কথা বলতে দেওয়া না হয় অথবা আমরা যদি জাতীয় সমস্যার সমাধান সেখানে খুঁজে না পাই, তবে আমরা সেখানে চলে আসব যেখানে কথা বলার জন্য স্পিকারের কোনো অনুমতি লাগবে না। আমরা তখন জনগণের পার্লামেন্টে অর্থাৎ রাজপথে চলে আসব। এই দেশ কোনো দল, গোষ্ঠী বা পরিবারের নয়, এই দেশ ২০ কোটি মানুষের। আমাদের প্রত্যেককে এক একজন সাচ্চা পাহারাদার হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। কেউ অধিকার পকেটে এনে দেবে না, লড়াই করে অধিকার আদায় করতে হবে। আমাদের মাঝে মাঝে চোখ রাঙানো হয় এবং ভয় দেখানো হয়। আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, আমাদের ভয় দেখাবেন না। যাদের নেতারা হাসতে হাসতে ফাঁসির তক্তার ওপর দাঁড়াতে পারে, তাদের কোনো কিছুর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমাদের নেতৃবৃন্দ জনগণের মুক্তির যে রাস্তা রচনা করে গেছেন, সেই রাস্তা ধরে আমরা চলতেই থাকব।
পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ আমাদের প্রতিবেশী এবং আমরা প্রতিবেশীকে সম্মান করি। আমরা চাই আপনারা শান্তিতে থাকুন এবং আপনাদের দেশের ভেতরে মানবিক পরিবেশ তৈরি হোক। আমরা চাই না ধর্মের ভিত্তিতে সেখানে বিভাজন এবং অশান্তি হোক। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি সেখানে শুধু মুসলিম নামের পরিচয়ে মানুষকে নাজেহাল করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশের দিকে লাল চোখ দেখানো হচ্ছে। মনে রাখবেন, এটা তিতুমীরের বাংলাদেশ, হাজী শরীয়তুল্লাহর বাংলাদেশ এবং শাহ মখদুমের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশের দিকে চোখ রাঙাবেন না এবং কোনো হুমকি ধমকি দেবেন না। আমরা নিজেরাও শান্তিতে থাকতে চাই এবং আপনারাও শান্তিতে থাকুন। আমাদের শান্তি নিয়ে টান দিলে কারো শান্তিই থাকবে না। বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে যে মানবিক বিপর্যয় চলছে, সেই ব্যাপারে আপনাদের বক্তব্য ও পদক্ষেপ আমরা দেখতে চাই। আমরা বাংলাদেশে কোনো সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি করতে কাউকে দেব না। এই দেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলের। এদেশে যারাই জন্মগ্রহণ করবে, তারা সমান মর্যাদার ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার ভোগ করবে এবং যেকোনো মূল্যে আমরা এই ঐতিহ্য রক্ষা করব। আমাদের ঐতিহ্যের দিকে কেউ যদি কালো হাত বাড়ায়, তবে ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত তা রুখে দেবে।
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও ইতিহাস চর্চা নিয়ে তিনি বলেন, অতীতে দেশের যে সমস্ত ক্ষতি হয়েছে, অর্থনীতি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং কর্পোরেশন লুটপাট করে শেষ করে দেওয়া হয়েছে, তার ফলে যুবকদের বেকারত্ব দিন দিন বাড়ছে। এই সমস্যাগুলোর সমাধান কিভাবে হবে তা নিয়ে সংসদে চর্চা হওয়া উচিত। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, এখন চর্চা হয় ৫৫ বছর আগে কে কি ছিল না ছিল তা নিয়ে বাহাদুরি দেখানোর। অতীতে যার যে ভূমিকা ছিল আমরা তার জন্য স্যালুট জানাই, কিন্তু একটা জাতি যদি ভবিষ্যতের দিকে না তাকিয়ে চিংড়ি মাছের মতো শুধু পেছনের দিকে তাকায়, তবে সেই জাতি জীবনেও এগিয়ে যেতে পারবে না। ইতিহাস আমরা চর্চা করব ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য এবং ইতিহাসের সাথে বেইমানি করলে একটা জাতিকে কতটা মূল্য দিতে হয় তা জানার জন্য, কিন্তু ইতিহাস নিয়ে পড়ে থাকব না।
আঞ্চলিক পানির সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের চারভাগের একভাগ অঞ্চল আজ পদ্মা এবং তিস্তার কারণে মরুভূমি হয়ে গিয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রথম সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরীক্ষামূলকভাবে ১৫ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধের কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু ৫৫ বছরেও সেই ১৫ দিন শেষ হয়নি। ফলে পদ্মা শুকনা মৌসুমে মরুভূমি আর বর্ষার মৌসুমে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন কৃষকের পানির প্রয়োজন হলেও পানি নেই। সরকার পদ্মা ব্যারেজের যে ঘোষণা দিয়েছে তার জন্য আমরা সাধুবাদ জানাই, তবে এই ঘোষণা যেন শুধু লোক দেখানো না হয় এবং বাস্তবে রূপ নেয়। তিস্তাসহ অন্যান্য নদীর পাড়ের আড়াই কোটি মানুষের দুঃখ দুর্দশা দূর করার জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। বিএনপির নেতা যিনি বর্তমানে একজন মন্ত্রী এবং ওই অঞ্চলে যাঁর বাড়ি, তিনি নির্বাচনের আগে তারেক রহমানসহ সবাইকে নিয়ে তিস্তাপারে বিশাল মিটিং মিছিল করেছিলেন। সারা বাংলাদেশ থেকে সাংবাদিকরা সেখানে গিয়েছিলেন নির্বাচনী আমেজ তৈরি করার জন্য। যদি তাই হয়ে থাকে, তবে মনে রাখবেন যে স্লোগান দিয়েছিলেন জাগো বাহে, বাহেরা কিন্তু এখন জেগে আছে এবং তারা দুই চোখ দিয়ে তাকিয়ে আছে যে সেদিন যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন করেন কি না। কারো রক্তচক্ষুর দিকে না তাকিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে এবং পদ্মার পানি ও তিস্তার পানি আমাদের ন্যায্য পাওনা হিসেবে আদায় করতে হবে। বাংলাদেশের ১৫৪টি অভিন্ন নদী আজ মৃতপ্রায়। খালের পানির উৎস হলো নদী, তাই নদী যদি ঠিকমতো না চলে তবে খালের পানি আসবে কোত্থেকে? আগে নদীর দিকে নজর দিন, পাশাপাশি খালের দিকেও নজর দিন। খাল কাটা কর্মসূচি যদি শুধু জনগণের মানসিক প্রশান্তির জন্য লোক দেখানো করা হয়, তবে তা বুমেরাং হয়ে দেখা দেবে। আমরা নদী ও খালের নাব্যতা এবং যৌবন ফিরিয়ে আনার পক্ষে, কোনো ভালো কাজের বিরোধী আমরা নই।
সমাপনী বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার ইতিমধ্যে যে অপকর্মগুলো করেছে এবং জাতির সাথে যে ধোকা দিয়েছে, বিশেষ করে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ১৬টি অধ্যাদেশ তারা ফেলে দিয়েছে। এগুলো যদি তারা বাস্তবায়ন না করে, তবে আমাদের আন্দোলন সংসদে এবং রাজপথে একসাথে চলবে। গণভোটের রায় বাংলাদেশে অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে এবং বাস্তবায়ন করতে বাধ্য করা হবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়িত হলে দেশে সুশনের পথ সুগম হবে, না হলে অতীতের চেয়েও ভয়াবহ স্বৈরশাসন জাতির ঘাড়ে চেপে বসবে। তিনি দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সামাজিক ঐক্য ও গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, চাঁদাবাজরা আসলে তাদের প্রতি উত্তম মেহমানদারির ব্যবস্থা করে প্রশাসনের হাতে তুলে দিন। আমরা যদি তা পারি, তবে সরকার লাগবে না, জনগণের শাসনেই বাংলাদেশ ঠিক হয়ে যাবে। সরকার এটা করবে না কারণ সর্ষের ভেতরেই ভূত রয়েছে। দানা দানা, ঘাট ঘাট এবং জনে জনে মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ভূত। এই ভূত তাড়ানোর জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং দেশের জন্য, জাতির জন্য ও আল্লাহর দ্বীনের জন্য লড়ে যেতে হবে। জান দেব কিন্তু দেশের মান দেব না এই শপথ নিয়ে সমাজ বদলে দেওয়ার জন্য তিনি সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল ও রাজশাহী অঞ্চল পরিচালক মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি’র সভাপতিত্বে সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমীর মাওলানা আব্দুল কাইউম সুবহানী, খেলাফত মজলিশের নায়েবে আমীর অধ্যাপক সিরাজুল হক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী, জাগপার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন প্রধান, এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরা শারমিন, রাজশাহী মহানগরীর আমীর ড. মো. কেরামত আলী এমপি, পাবনা জেলার আমীর অধ্যাপক আবু তালেব মণ্ডল এমপি, জয়পুরহাট জেলার আমীর মো. ফজলুর রহমান সাঈদ এমপি, এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান ইমন, বগুড়া মহানগরীর আমীর অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আবু জার গিফারী, রাজশাহী জেলা আমীর অধ্যাপক আব্দুল খালেক, বগুড়া জেলার আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হক, সিরাজগঞ্জ জেলার আমীর মো. শাহিনুর আলম, নওগাঁ জেলা আমীর মো. আব্দুর রাকিব, নাটোর জেলার আমীর ড. মীর নুরুল ইসলাম, রাজশাহী মহানগরীর নায়েবে আমীর ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর প্রমূখ।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, জনগণ আজ দুঃসহ জীবনযাপন করছে। প্রতিদিন হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশ হচ্ছে। ভারত বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে কাজ করছে। ভারতে মুসলমানদের নামাজ পড়তে দেওয়া হচ্ছে না, মসজিদ ভাঙা হচ্ছে। আমরা কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করি না, কিন্তু আমাদের প্রতিও হুমকি বরদাশত করা হবে না। তিনি আরও বলেন, এখন দলীয়করণের মাধ্যমে অযোগ্য লোকদের বিভিন্ন পদে বসানো হচ্ছে। আমরা কোনো দলীয় নেতা বা মন্ত্রী চাইনি; আমরা চেয়েছি সংস্কার। দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভয়াবহ। বিদেশের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেদের উৎপাদন বাড়াতে হবে। আপনারা যাদের মন্ত্রী বানিয়েছেন তাদের অনেকেরই যোগ্যতা নেই। তারা জনগণের নয়, নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত। দেশের সমস্যা সমাধানে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে সংস্কার করতে হবে।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমীর মাওলানা আব্দুল কাইউম সুবহানী বলেন, জুলাই সনদ অস্বীকার করা বিএনপির সবচেয়ে বড় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ১১ দলীয় ঐক্যের উচিত এই রায়ের বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে নামা।
খেলাফত মজলিশের নায়েবে আমীর অধ্যাপক সিরাজুল হক বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের তিন মাসের মধ্যেই ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অস্বীকার করেছে। বাংলাদেশ কারও ক্রীতদাস নয়। জুলাই আন্দোলনের মূলমন্ত্র ছিল—“মেধা, মেধা”। অথচ এখন সর্বত্র দলীয়করণ চলছে এবং মেধার পরিবর্তে কোটাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য ততটুকুই গ্রহণযোগ্য যতটুকু কুরআন-হাদিসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যতদিন জনগণের রায় বাস্তবায়িত না হবে, ততদিন আন্দোলন চলবে। সরকার “না” ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েও জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট “হ্যাঁ”-এর পক্ষে পড়েছে। তাই জনগণের রায়কে সম্মান জানাতেই হবে। তিনি বলেন, সরকার সাড়ে চার কোটি মানুষের রায়কে অস্বীকার করছে। জনগণের রায় মানা না হলে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী বলেন, জুলাই আন্দোলন না হলে আজ অনেকে দেশে ফিরতেই পারতেন না। মনে রাখবেন, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ “হ্যাঁ” ভোট দিয়েছেন। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না। দেশের সর্বত্র চাঁদাবাজি চলছে। আমরা পদ্মা নদীর ন্যায্য হিস্যা চাই এবং সরকারকে ভারতের কাছ থেকে তা আদায় করতে হবে।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, আমরা গণভোটে “হ্যাঁ” ভোট দিয়েছি, কিন্তু সরকার এখন জনগণের রায় নিয়ে গড়িমসি করছে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির যে আদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সেই একই সাংবিধানিক ভিত্তিতেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন বৈধ হলে গণভোট কেন অবৈধ হবে? বিএনপির সবচেয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হলো দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অস্বীকার করা। জনগণ এর দাঁতভাঙা জবাব দিতে প্রস্তুত।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন বলেন, জনগণ এখন এই মুনাফিকদের চিনে ফেলেছে। মানুষের চাওয়া ও দেশের স্বার্থ বাস্তবায়ন করুন। আমরা আপনাদের ভুয়া বলতে চাই না।
জাগপার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন প্রধান বলেন, মওলানা ভাসানী ফারাক্কা ইস্যুতে এখানেই সমাবেশ করেছিলেন। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে পদ্মায় পর্যাপ্ত পানি থাকবে। পদ্মা শুকিয়ে গেলে সরকারও টিকে থাকতে পারবে না। ভারতের সঙ্গে গোপন সমঝোতা বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেবে না।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর আমরা ভেবেছিলাম ক্ষমতায় যারা আসবে তারা শিক্ষা নেবে। কিন্তু বিএনপি সরকার তিন মাস না যেতেই অতীত ভুলে গেছে। মানুষ তারেক রহমানকে দেখে নয়, জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব দেখে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। অথচ ক্ষমতায় এসেই তারা ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে উপহাস করছে। তিনি বলেন, সীমান্তে প্রতিদিন মানুষ হত্যার ঘটনা আবার বাড়ছে। দেশে নতুন করে চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে। বিএনপি কি শুধু বিএনপির সরকার, নাকি পুরো বাংলাদেশের সরকার? আমরা জাতীয় নির্বাচনের ফল মেনে নিয়েছি। কিন্তু আমাদের অধিকার কেড়ে নিতে চাইলে আমরা ঘরে বসে থাকবো না। তিনি আরও বলেন, বিএনপি খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে—এজন্য ধন্যবাদ। কিন্তু নদীতে পানি না থাকলে খাল খনন করে কী লাভ? আমরা দ্রুত জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং ৭০ শতাংশ মানুষের রায়ের সম্মান চাই।
বগুড়া মহানগরীর আমীর অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল বক্তব্যে বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে অবহেলা করে কোনো রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। মানুষের ভোট ও অধিকারকে সম্মান করতেই হবে।
বগুড়া জেলার আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হক বলেন, তারেক রহমান নিজে “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে প্রচারণা করেছেন এবং ভোটও দিয়েছেন। অথচ এখন ৭১ শতাংশ মানুষের ভোটের রায় নিয়ে টালবাহানা করা হচ্ছে। আমরা ১৭ কোটি মানুষের জন্য একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে নেমেছি।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, আমাদের সামনে জীবন দিয়ে আবু সাঈদ ভাই বলে গেছেন—দেশকে রক্ষা করতে হলে রক্ত দিতে হবে। আমরা এখানে চাঁদাবাজি করতে আসিনি। আমরা এসেছি ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শহীদদের অধিকার রক্ষার জন্য। অনেক ভাই আজ পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে আছেন। তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে আমাদের ভোট চুরি করা হয়েছে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা নীরব ছিলাম। জিয়ার পুত্র তারেক রহমানকে বলতে চাই—আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে বাধ্য করবেন না। জুলাই সনদ নিয়ে তামাশা করবেন না। জনগণের রায় নিয়ে গড়িমসি করলে আপনাদের পরিণতিও আওয়ামী লীগের মতো হবে। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করি না। সীমান্তে প্রতিনিয়ত হত্যাকাণ্ড বাড়ছে। এমন সম্পর্ক আমাদের প্রয়োজন নেই। ভারতকে আমরা ভয় করি না। পদ্মা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়েও তারা টালবাহানা করছে। অন্যদিকে সরকার তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে জনগণের সঙ্গে তামাশা করছে। অবিলম্বে এসব সংকট নিরসন করে জনগণের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
রাজশাহী বিভাগীয় সমাবেশের সভাপতি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, গণভোটে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও গণভোটের প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। অথচ এখন বলা হচ্ছে জনগণ গণভোট বোঝে না। বিএনপি নেতারা পাগল হতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ পাগল নয়। তারা বুঝেশুনেই ভোট দিয়েছেন। তাই দ্রুত জনগণের রায় মেনে নিতে হবে।