ফ্যাসিস্ট হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে পাবনা যখন উত্তাল ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত তখন ৪ আগস্ট ২০২৪ আওয়ামী গুন্ডা সাঈদ গংদের উপর্যুপরি গুলিতে আপনার ট্রাফিক চত্বরে ( বর্তমানে শহীদ চত্বর) রক্তে রঞ্জিত হয় । শহীদ হয় পাবনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এর ছাত্র জাহিদুল ইসলাম ও পাবনা সিদ্দিক মেমোরিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মাহবুব হাসনাত নিলয় আহত হয় অসংখ্য ছাত্র জনতা। ছাত্র জনতার প্রতিরোধের মুখে আমি গুন্ডারা প্রথম পর্যায়ে কিছু হটে,পরে শহীদ জাহিদের লাশ নিয়ে মিছিল করলে পুনরায় পাবনা সদরের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক খন্দকার প্রিন্স ও পাবনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আ স ম আব্দুর রহিম পাকনের নেতৃত্বে লাশের মিছিলের উপর গুলি চালায় ফলে অসংখ্য ছাত্র-জনতা আহত হয়। মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে ছাত্র জনতা দিক্বিদিক ছুটতে থাকে। এই হত্যা মামলায় শহীদ জাহিদের বাবা দুলাল উদ্দিন মাস্টার পাবনা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ এক বছর সময়ের মধ্যে এ মামলার প্রধান আসামি সহ উল্লেখ করার মতো তেমন কোন আসামিকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেন নাই। নামমাত্র কয়েকজন আসামিকে গ্রেফতার করে লোক দেখানোর ভান করে চলছে জেলা পুলিশ প্রশাসন। পুলিশের এমন ভূমিকায় শহীদ পরিবারের সদস্যরা হতাশ। আরো আদৌ সন্তোষজনক জনক বিচার পাবে কিনা এ ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। পাবনার দুই শহীদের পরিবারের সাথে কথা বলে যা জানা গেল, জাহিদের বাবাকে বলেছিল, “আব্বু, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করলে সবসময় সামনেই থাকতে হয়, পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই ”
শহীদ জাহিদুল ইসলাম পাবনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইলেকট্রনিকস বিভাগের এক মেধাবী শিক্ষার্থী। স্কুল শিক্ষক মো. দুলাল উদ্দিনের তিন ছেলের মধ্যে দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই জাহিদ ছিলেন নম্র, ভদ্র এবং সততার প্রতীক। ছিলেন নিরহংকার, শান্ত ও মার্জিত যুবক। তবে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন সম্পূর্ণ আপোসহীন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পাবনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নিয়মিত আন্দোলনে যেতেন এবং নেতৃত্ব দিতেন। তার সঙ্গে থাকতেন তার বড়ো ভাই তাওহীদ।
একদিন টিভিতে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া অবস্থায় জাহিদ ও তাওহীদকে দেখে পিতা দুলাল উদ্দিন উদ্বিগ্ন হয়ে ছেলেকে বললেন, "বাবা, মিছিলে গেলে একটু মাঝখানে থেকো, তাহলে বিপদের আশঙ্কা কম থাকবে।" জাহিদ তখন উত্তর দিয়েছিলেন, "আব্বু, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করলে সবসময় সামনেই থাকতে হয়, পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই।" ছেলের এমন কথায় সেদিন পিতার বুক গর্বে ভরে উঠছিল।
শহীদের বাবা স্ত্রী সন্তানসহ চর বলরামপুরে থাকেন। শহীদ জাহিদুলসহ তার ৩টা ছেলে ও ১টা মেয়ে। শহীদের বাবা প্রাইমারি স্কুলের একজন শিক্ষক।
শহীদ জাহিদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রথম থেকেই সক্রিয় ছিলেন। ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে অন্যান্য দিনের মতোই মিছিলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পিতা যখন বাড়ি থেকে বের হচ্ছিলেন, জাহিদ তাকে বলল, "বাবা, টাকা দিয়ে গেলে না?" পিতা বললেন, "ড্রয়ারে আছে, নিয়ে যাও।" এটিই ছিল বাবা-ছেলের মধ্যে শেষ কথোপকথন।
জাহিদ পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন, যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে পাবনা ট্রাফিক মোড়ে অবস্থান নেয়। ছাত্ররা সেখানে বসে বা দাঁড়িয়ে দেশাত্মবোধক গান গাচ্ছিল। ৪০ মিনিট পর পাবনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ভাঁড়ারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু সাঈদ খান একটি জিপগাড়ি নিয়ে সমাবেশের পাশে এসে গাড়ি থেকে নেমে সে ও তার সহযোগী নাসির অস্ত্র হাতে শিক্ষার্থীদের ওপর এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। শিক্ষার্থীরা প্রাণ বাঁচাতে এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে। অনেকের বুকে, পিঠে, মাথায় ও চোখে গুলি লাগে। মুহূর্তের মধ্যে পাবনা ট্রাফিক মোড় করুণ আর্তনাদে ভরে ওঠে।
আবু সাঈদ খানের ছোড়া একটি গুলি এসে লাগে জাহিদুল ইসলামের মাথার নিচে। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এভাবেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত এক প্রাণের অবসান ঘটে। জাহিদুলের শাহাদাতের পর তার পরিবার ও সহপাঠীরা তার লাশ নিয়ে পাবনার আব্দুল হামিদ রোডে মিছিল করে। কিন্তু সেই মিছিলে আবারও গুলি চালায় সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্সসহ আরও কিছু আওয়ামী লীগ নেতা, যার ফলে আরও অনেকেই আহত হন।
জাহিদুল ইসলামের মতো সাহসী যুবকরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নকে বাস্তব করতেই তারা শহীদ হয়েছেন।
শহীদ জাহিদুল ইসলামের বড়ো ভাই তাওহীদ বলেন, "জাহিদ খুবই ভালো, নম্র-ভদ্র একজন ছেলে ছিল। কী অপরাধে আমার ভাইকে গুলি করা হলো, তা আমি বুঝতে পারি না। আমি এই নির্মম হত্যার অনতিবিলম্বে সুষ্ঠ বিচার চাই।"
মো: মাহবুব হাসান নিলয় পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেল
শহীদ মাহবুব হাসান নিলয় সিদ্দিক মেমোরিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ফুটবলে দারুণ পারদর্শী ছিলেন। শহীদের বাবা আনসার বাহিনীর একজন সদস্য। । গত ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সকাল ১১টায় পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে মিছিল বের হওয়ার কথা ছিল। সকাল ৮টা বাজতেই শহীদ নিলয়ের মন মিছিলের জন্য ছটফট করতে থাকে। সদ্য সৌদি আরব থেকে ফেরা বড়ো ভাই মেহেদী হাসান মিলন, বোন মাহবুবা নাজনীন এবং মাহবুব হাসান নিলয়— তিন ভাইবোনই মিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। মা দিল আফরোজা ছেলেকে বললেন, “তোমরা মিছিলে যাবে, তাহলে তোমাদের লাঠি কোথায়?” মায়ের কথা শুনে মাহবুব যেন আরও সাহস পায়, নিজেই তিনটি লাঠি বানিয়ে নেয়।মায়ের হাতে খাবার খেয়ে বড়ো ভাই মিলন দেওয়া টাকা নিয়ে মাহবুব বাড়ি থেকে বের হয়ে স্থানীয় অন্যান্য ছেলেদের আন্দোলনে যাওয়ার জন্য ডাকতে গেল। কিছুক্ষণ পর মাহবুব বাড়িতে ফিরে এসে দেখল, দেরি দেখে মিলন ও মাহবুবা রিকশা নিয়ে আন্দোলনের স্থানে চলে গেছেন। এরপর মাহবুব পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের সামনে চলে গেল। ইতোমধ্যে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী সেখানে জমায়েত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে পাবনা ট্রাফিক মোড়ে অবস্থান নিয়েছে। শিক্ষার্থীরা সেখানে দাঁড়িয়ে দেশাত্মবোধক গান গাচ্ছিলেন। প্রায় ৪০ মিনিট পর হঠাৎ পাবনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভাঁড়ারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু সাঈদ খান তার জিপগাড়ি নিয়ে মিছিলের উত্তর পাশের রাস্তায় এসে উপস্থিত হয়। গাড়ি থেকে নেমে চেয়ারম্যান এবং তার সহযোগী নাসির অস্ত্র হাতে নেয়। সেখান থেকেই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। শিক্ষার্থীরা দিগি¦দিক ছুটতে শুরু করেন। কেউ বুকে, কেউ পিঠে, কারও মাথায়, আবার কারও চোখে গুলি লাগে। মুহূর্তেই চিৎকার-আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে পাবনা ট্রাফিক মোড়ের বাতাস। রাজপথ হয় রক্তাক্ত। সাঈদ খানের ছোড়া একটি গুলি এসে শহীদ মাহবুবের বুকে লাগে। তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এভাবেই শেষ হয়ে যায় মাহবুব হাসান নিলয় নামের এক তরুণের অধ্যায়।
শহীদ মাহবুব তাঁর বাবা আবুল কালাম আজাদের শাসন ভয় পেতো। একদিন সাহস করে বলেছিল, “বাবা, তুমি তো আমাকে এত শাসন করো, আমি না থাকলে তখন অনেক মনে পড়বে।” আজ বাবা আবুল কালাম আজাদ তাঁর ছেলের কথা মনে হলেই অঝোরে কাঁদতে থাকেন। মা দিল আফরোজা ভাত নিয়ে বসে থাকেন মাহবুবের জন্য, কিন্তু মাহবুব আর আসবে না। চিরদিনের জন্য চলে গেছে, রেখে গেছে তাঁর সকল স্মৃতি টুকরো। শহীদ মাহবুব নিলয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁর এক প্রতিবেশী চাচা বলেন, “মাহবুব নিলয় ছিল অত্যন্ত ভালো ছেলে। ছোটোবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। সে খেলাধুলা করতে ভালোবাসতো এবং প্রায়শই মাঠে সময় কাটাতো।”
শহীদ মাহবুব নিলয়ের বাবা আবুল কালাম আজাদ জানান আমার সন্তান হত্যার বিচার কবে পাবো আদৌ কি পাবো কিনা দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি, কারণ পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডলার উপর দিয়েই হত্যাকারীরা চলাফেরা করছে তাদের গ্রেফতার করার কোন লক্ষণ দেখছি না।
শহীদ জাহিদুল ইসলাম ও মাহবুব হাসান নিলয় মতো সাহসী যুবকরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নকে বাস্তব করতেই তারা শহীদ হয়েছেন।