১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

১৫ মে, ২০২৬

বগুড়ার আধুনিক ক্রিকেটের রূপকার শরফুদ্দিন আহমেদ টুটু

মোঃ শহীদুল ইসলাম প্রকাশিত: অগাস্ট ১১, ২০২৫, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন
বগুড়ার আধুনিক ক্রিকেটের রূপকার শরফুদ্দিন আহমেদ টুটু


বন্ধুগন সালাম নিবেন। আজকে যাকে আপনাদের সাথে পরিচয় করে দিব তিনি বগুড়া তথা উত্তর বঙ্গ সহ ঢাকা মাঠের ৭০ দশকের সেরা ক্রিকেটারদের একজন। তিনি ছিলেন বগুড়ার আধুনিক ক্রিকেটের রুপকার। তিনার কথা বলার আগে আরো একজন ক্ষনজন্মা ক্রিকেটার এর নাম না বল্লেই নয়। যিনি হলেন বগুড়ার ক্রিকেটার মরহুম রশিদুন নবী অনু ভাই। এই অনু ভাই ছিলেন বগুড়ার ক্রিকেটের আদি পিতা।

উচ্চ শিক্ষিত অনুভাই বহু দেশ বিদেশ ঘুরেছেন। এবং ততকালে ঢাকায় চাকরীর সুবাদে বিদেশী এই ক্রিকেট খেলাকে রপ্ত করে তিনিও পারদর্শী হয়ে যান। তিনিই প্রথম বগুড়ার মাঠে ততকালে যুবকদের ক্রিকেটের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন। তার হাতেই প্রথম ক্রিকেটের সুভ সূচনা হয় এই বগুড়াতে। এজন্যই তাঁকে বগুড়ার ক্রিকেটের আদি পিতা বলা হয়। তিনি চাকুরী জিবনে গ্যাটকোর ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসাবে অবসর নেন। আমি ডি,এস,এর সেক্রেটারী থাকাকালিন বগুড়ার সকল প্রাক্তন ক্রিড়া বিদ দের নিয়ে দিন ব্যাপি ‘ক্রিড়াঙ্গনে বগুড়া’ নামে একটি অনুষ্ঠান করেছিলাম। সেখানে অনু ভাইও এসেছিলেন। তিনি বক্তব্য প্রদানকালে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁর দু চোখ দিয়ে  অঝোরে পানি ঝরতে থাকে। তাঁকে উপযুক্ত সম্মান দিতে পেরে আমিও ধন্য হই। বগুড়ার অনুষ্ঠান থেকে শেষ বারের মত ঢাকা ফিরে কিছুদিন পরই তিনি মারা যান। চির বিদায় নিলেন বগুড়ার ক্রিকেটের আদি পিতা।


টুটু অধ্যায় শুরুঃ
অনু ভাই এর হাতে জ্বালানো বগুড়ার ক্রিকেট প্রদিপ যখন টিম টিম করে জ্বলছিল, ঠিক তখনই এই নতুন জনক বা কারিগর টুটু ভাই ঐ নিভু নিভু আলোর প্রদীপ ঘসে মেজে পরিস্কার করেন। প্রদীপের আলোর ছটাকে ফ্লাড লাইটে পরিনত করেন। তাঁরই অনুপ্রেরনায় বগুড়ার ক্রিড়া অংঙ্গনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। শুরু হয় বগুড়ায় ক্রিকেট জোয়ার। তিনিই আধুনিক ক্রিকেটের কলা কৌশল এর প্রথম তালিম দেন। আজ শোনাবো সেই রুপকথার এই রুপকারের কাহিনী। যা একেবারেই বাস্তব।


শরফুদ্দিন আহমেদ টুটুর জন্ম ১৯৪৭ সালে বগুড়া জেলার সুখানপুকুর নওদাবগাঁয় নানার বাড়িতে। বাবা ততকালে বৃটিশ আমলে সরকারী চাকুরে ছিলেন। মাত্র সাত বছর বয়সে টুটু ভাইকে তাঁর নানি নিজের করে কাছে নেন। গড়ে তোলেন নিজের মত করে। তাই তাঁর নানীই ছিলেন তাঁর কাছে সব। টুটু ভাই এর নানি ছিলেন বিদুষী নারী। তিনি সাতটি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। তার নানা ছিলেন বৃটিশ আমলের ম্যাজিষ্ট্রেট।


১৯৬২ সালে জিলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন টুটু ভাই। স্কুল জিবন থেকেই তিনি ক্রিকেট, হকি, এবং ফুটবল সহ শর্টপুট থ্রো তে পারদর্শী  হয়ে উঠেন। দেশ সেরা ফুটবলার আবাহনী ক্লাবের স্বর্গীয় অমলেশ সেন টুটু ভাই এর বাল্য বন্ধু ছিলেন। বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠের পশ্চিম পার্শের বাসায় থাকতেন টুটু ভাই। আর মাঠের পূর্ব -দক্ষিণ কোনায় থাকতেন অমলেশ সেন। দেশের সেরা স্থপতি বিশিষ্ট টি, ভি, (টক সো) ব্যক্তিত্ব এবং বি,সি,বি র সাবেক পরিচালক ক্রিড়া সংগঠক  বগুড়ার কৃতি সন্তান  মোবাশ্বের হোসেনও এই টুটু ভাই এর বন্ধু।


১৯৫৭ সালে স্কুল জিবনেই তিনি বগুড়ার ইয়ং রোবার্স (গুরু অনু ভাই এর টিম) এর হয়ে বগুড়া ক্রিকেট লীগ শুরু করেন। তখন বগুড়ায় মাত্র তিনটি ক্লাব ছিল। হাতে গনা মাত্র কজন প্লেয়ার। তাঁদের মধ্যে অনু ভাই, রবু ভাই, কামাল হায়দার,মন্টু ভাই, মান্না ভাই, বাবু ভাই, বেনু ভাই, কাসেম ভাই আসাদ ভাই,প্রমুখ ছিলেন অন্যতম। পরবর্তীতে যুক্তহন কাজি বাদল (আমার গুরু) ভাই , দিপু ভাই, জাম্পু ভাই, পুনটুলী ভাই, ফটিক ভাই, মন্জু ভাই, নিতু ভাই, লেবু ভাই, অহীদ ভাই, শহীদ ভাই, টুটু ভাইয়ের  আপন ছোট ভাই টেনা ভাই, রাজিউল্লা ভাই, টুনু ভাই,মুকুল ভাই, মুরাদ ভাই, হিরু ভাই সহ আরো অনেকেই। মূলত: উল্লেখিত খেলোয়াড় গনদের সমন্ময়ে গঠিত বগুড়ার জেলা দল ছিল বরাবরই উত্তর অঞ্চলের  সেরা দল। রাজশাহী জেলা দল কখনই বগুড়া কে হাড়াতে পারতো না। পরবর্তীতে টুটু ভাই এর হাতে গড়া বহু ক্রিকেটার পয়দা হয়েছেন। যারা দেশের প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটার ছিলেন। তাঁদের নিয়ে আজ নয় পরবর্তীতে লিখবো।  বিশেষ করে বন্ধুবর  রওনক টুটুল, পপলু ভাই, অহীদুল ভাই, দুলাল ভাইকে নিয়ে না লিখলে, বগুড়ার ক্রিকেটের পূর্নতাই আসবে না।


টুটু ভাই অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাশনাল টিমে কল পেলেও নানীর বাধার কারনে যেতে পারেননি। তাই নানী ভক্ত এই ক্রিকেটার কে ঢাকা-বগুড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছে। তিনি একজন ফুটবল সংগঠকও ছিলেন বটে। বগুড়ার হোয়াইট ক্লাব ১৯৬২ সালে তাঁর নেতৃত্বেই গঠিত হয়। দেশ স্বাধীনের পর তিনি আবার ঢাকার ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের হয়ে  ১৯৭৬ইং সালে লীগে খেলেন। তিনি তখন জাতীয় দলের  ক্রিকেটার দৌলত ভাই, পাবনার মাসুদ ভাই এর চাইতেও জোরে বল করতেন। বিশাল দেহী মানব পাহাড়খ্যাত এই টুটু ভাইয়ের পাঁয়ের হাটুতে আঘাত পাওয়ায় তার খেলোয়াড়ী জীবনে প্রায়ই স্থবিরতা দেখা দিতো। এক সময় বাধ্য হয়েই তাঁকে ইতি টানতে হয়। সমাপ্তি ঘটে একজন বড় মাপের খেলোয়াড় এর খেলোয়াড়ী জীবনের। 


অসম্ভব একজন  বিনয়ী,  নর্ম,  ও ভদ্র  লোকের  সান্নিদ্ধ পেয়ে আমিও গর্বিত। আরো গর্বিত তাঁর সাথে খেলতে পেরে। তাঁর রেখে যাওয়া শিষ্যদের এবং অক্ষয় কীর্তিগুলির কথা আর একদিন সময় করে লিখবো। আমি বড়ই গর্ববোধ করি যখন আমার মোবাইলে হঠাৎ তাঁর রিং টোন বেজে ওঠে। এতো পরিচিত তাও ভেবেই পাই না যে কি বলতে কি বলবো! কোন কথা বলবো!!  ইত্যাদী ইত্যাদী!!  আল্লাহ আপনি  এই ব্যক্তিকে অনেক দিন আমাদের মাঝে রাখুন।
ব্যক্তিগত জিবন : তিনি একজন সফল পিতা। মেয়ে রাজশাহী বোর্ড থেকে ষ্ট্যান্ড করা ছাত্রী। মেয়েটি এখন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে বড় আসনে চাকুরী রত। জামাই আর্মীর কর্নেল। আর ছেলে  ব্রাক ব্যাংকের গুনি স্যারদের একজন। বগুড়ার নিউ মার্কেটের শরাফাত মার্কেটের স্বত্তাধিকারী এই টুটু ভাই। তাঁর ছোট ভাই টেনা একসময় ভালো ক্রিকেটের বোলার ছিলেন এবং জাতীয় পার্টির রাজনীতির সাথে স্বক্রিয় ভাবে জড়িত ছিলেন। টেনা ভাই ইন্তেকাল করেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। টুটু ভাই বর্তমানে স্ত্রী/সন্তানদের কে নিয়ে ঢাকা ক্যান্টন মেন্টের বাসায় থাকেন। আমরা তাঁর সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়্যু কামনা করছি।


মোঃ শহীদুল ইসলাম
সাবেক ক্রিকেটার এবং
সাবেক সাধারণ সম্পা
জেলা ক্রীড়া সংস্থা বগুড়া।