ছদ্মনাম আহমেদ। দেশের একটি নামকরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স পাস করেছেন। অর্থনীতি বিষয়ের উপর। দুই বছর আগে সর্ব শেষ শিক্ষা সনদ হাতে পেয়েছেন। নানা জায়গায় চাকরির জন্য আবেদন করেছেন। লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছেন। কোথাও চাকরি হয়নি। না সরকারিতে, না বেসরকারিতে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে হতাশা গ্রাস করছেন। যে-কোনো মূল্যে এখন তার একটা চাকরি লাগবেই। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, তুমি কী ধরনের কাজ জানো বা করতে পরবা? উত্তরে আহমেদ বলেন, হলেই হলো একটা। আবার জিজ্ঞাসা করা হলো, তুমি কি কম্পিউটার চালাতে জানো? উত্তরে আহমেদ বলেন, জানি। ফেসবুক চালাতে পারি। ম্যাসেজ লিখতে পারি। ইউটিউব দেখতে পারি। তুমি কি গ্রাফিক্স, এমএস ওয়ার্ড, এক্সএল, ভিডিও এডিটিং, ছবির কাজ, পেজ মেকাপ এসব পারো? এবার উত্তরে আহমেদ, এসব পারি না। তবে দেখে দিলে পারবো।
আহমেদের মতো করেই দেশের সর্বোচ্চ সনদপ্রাপ্ত কর্মসন্ধানীদের একই রকম অবস্থা। শিক্ষা অর্জন করা হয় শুধুমাত্র একটি সনদের জন্য। হাতে কলমে কেউ কিছু শিখতে চায় না, শেখানোও হয়নি। ফলে জীবন থেকে ১৮/২০ বছর চলে যায় অপরিকল্পিতভাবেই। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীরাই তাদের জীবনের লক্ষ্য জানে না। কাজ শেখার আগ্রহ থাকে না। এভাবে শিক্ষা জীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশে প্রবলভাবে বাধার শিকার হয়। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে রাজনৈতিক ফয়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে গণহারে পাস করে দেওয়া হয়েছে। যার কুফল এখন পুরো জাতি ভোগ করছে। কর্মমুখী শিক্ষা বা এক মুখি শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে নজর না দেওয়ায় শুধু নামধারী শিক্ষিত মানুষের জটলা বেড়েছে। কাজের লোকের অভাব সৃষ্টি হয়েছে। দেশের যে-কোনো বড় স্থাপনায় বিদেশ নির্ভর হতে হচ্ছে। দেশে যদি কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত জনবল তৈরি করা যেতো তাহলে জনগণ সম্পদে পরিণত হতো। দেশের কাজ দেশের জনবলই করতে পারতো।
এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড এই চিরন্তন সত্যটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একুশ শতকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং বাস্তব জীবনে প্রয়োগের উপযোগী দক্ষতা অর্জন করা অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটে, ব্যক্তির পেশাগত জীবনের উৎকর্ষ সাধন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য কর্মমুখী শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি। যে শিক্ষা মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট কর্মে প্রশিক্ষিত করে তোলে এবং জীবিকা অর্জনের যোগ্যতা দান করে, তাই কর্মমুখী শিক্ষা বা বৃত্তিমূলক শিক্ষা।
বাংলাদেশের উত্তর জনপদের মানুষ আরো বেশি অদক্ষ হয়ে বড় হয়েছে। এই অঞ্চলে এখনো ভালো কোনো কর্মমুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। গড়ে ওঠেনি বেসরকারি পর্যায়ের কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানও। ফলে এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ দিনমজুরে পরিণত হয়েছে। কৃষি শ্রমিক, রিক্সা চালক, পরিচ্ছন্নতা কর্মীর পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
দেশ তথা এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের কথা চিন্তা করেই ‘টেকসই জীবনমান গবেষণা কেন্দ্রে’র উদ্যোগে ‘বাংলাদেশে বৃত্তিমূলক শিক্ষার সংকট ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
শনিবার সকালে সরকারি মজিবর রহমান ভান্ডারী মহিলা কলেজের শিক্ষক মিলণায়তনে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি শাহ্ সুলতান কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. শাহাদৎ হোসেন সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রবন্ধে তিনি বৃত্তিমূলক শিক্ষার সামাজিক সংকট, সম্ভাবনা ও উত্তরণের পথ বিষয়ে আলোচনা করেন। এসময় তিনি বলেন, সরকারের নানা উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থী ও অবিভাবকগণ বৃত্তিমূলক বা কর্মমুখী শিক্ষায় আগ্রহী হচ্ছে না। মানুষের প্রথাগত ধারণা ও সামাজিক মর্যাদার পরিবর্তন করতে না পারলে কারিগরি শিক্ষার প্রসার সম্ভব না। প্রবন্ধে তিনি কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব, সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।
প্রবন্ধের উপর আলোচনাকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কাজী জুলফিকার আলী বলেন, ‘বাংলাদেশের কারি গড়ি শিক্ষা কাঠামোকে আরো আধুনিকায়ন করতে হবে। কৃষি, প্রকৌশলী শিক্ষা এবং স্বাস্থ শিক্ষার দিকেও সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে’। তিনি আরো বলেন, ‘কারি গড়ি শিক্ষাকে বাদ রেখে দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। কারি গড়ি শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং পরিধিকি বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রীয় দর্শন পরিষ্কার করতে হবে’।
সরকারি শাহ সুলতান কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. সাহিদুর রহমান, বলেন, আমাদের শিক্ষা সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে হবে। স্কুল থেকেই একজন শিক্ষার্থী পেশাগত মর্যাদার ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠবে এবং তার জন্য নির্ধারিত হবে নিদিষ্ট বৃত্তিমূলক শিক্ষা।
বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম বলেন, গবেষণা ছাড়াই প্রকল্প নেওয়া হয়, কোন খাতে কত মানুষের চাহিদা, কী ধরনের ট্রেড দেশে-বিদেশে প্রয়োজন তার মাঠ জরিপ নাই। ফলে অনেক ট্রেড শুরুতে চাহিদা হারায়।
বগুড়ার টিটিসি’র ইন্সট্রাক্টর রাশেদুল বলেন, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এই শিক্ষা পরিচালিত হতে হবে রাজস্ব খাত থেকে।
নেকটারের অবসরপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক বলেন, প্রশিক্ষণের অভাবে হাজার হাজার যুবক উচ্চ আয়ের আশায় বিদেশে গিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে এবং খুবই সামান্য রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সরকারি মজিবর রহমান ভান্ডারী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. বেলাল হোসেন। তিনি তার আলোচনায় বলেন, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার পরিভাষার পরিবর্তন জরুরি। এটা হওয়া উচিত ইঞ্জিনিয়ারিং। কারণ আমাদের সমাজের মানুষ ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দকে বেশি মর্যাদা দেয়। সেক্ষেত্রে শিক্ষার স্তর হওয়া উচিত ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রাইমারি, সেকেন্ডারি এবং টারশিয়ারি। এভাবে ঢেলে সাজালে সামাজিক মর্যাদার জায়গা বৃদ্ধি পাবে এবং মানুষ এ শিক্ষায় আগ্রহী হবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের উপদেষ্টা ড. মনসুর আহমেদ। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, সরকারি মজিবর রহমান ভান্ডারী মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুস ছাবুর খন্দকার, সরকারি আজিজুল কলেজের গণিত বিভাগের অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল মতিন, সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. রায়হান ইসলাম, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মোস্তফা কামাল সরকার, ভূগোল বিভাগের মুহাম্মদ আলমগীর হাসান, দৈনিক করতোয়া সিনিয়র রিপোর্টার রাহাত রিটু, দৈনিক মানবজমিনের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি, প্রতীক ওমর প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সরকারি মজিবর রহমান ভান্ডারী মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মীর ত্বাইফ মামুন।